অচেনা প্রেম
একটি রোমান্টিক গল্প
হঠাৎ বৃষ্টি নেমেছিল দুপুরবেলায়। আকাশটা ছিল মেঘলা অনেকক্ষণ ধরে, তবে তেমন কিছু বোঝা যাচ্ছিল না। মেঘের ফাঁকে ফাঁকে রোদ এসে পড়ছিল রাস্তার গায়ে। রোদ আর মেঘের এই লুকোচুরি খেলার মধ্যে দিয়েই বৃষ্টির আগমন।
সাইদ দাঁড়িয়ে ছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসির সামনে। ছাতা আনেনি, কারণ সকালের রোদ তাকে বোঝাতে পারেনি, প্রকৃতি আজ এমন খেলা খেলবে। চারপাশে মানুষজন ছুটে পালাচ্ছে, কারও হাতে ছাতা, কেউ বা আশ্রয় খুঁজছে গাছের নিচে।
সে তখন তাকিয়ে ছিল এক মেয়ের দিকে, যে টিএসসির সিঁড়িতে বসে ছিল একা। তার হাতে একটা খোলা ছাতা, কিন্তু সে তোলেনি। বৃষ্টির ফোঁটাগুলো ধীরে ধীরে তার কাঁধ ভিজিয়ে দিচ্ছে, চুলের ডগা থেকে পানি গড়িয়ে পড়ছে মাটিতে।
সাইদ এগিয়ে গেল।
— “আপনি ছাতা তুলছেন না কেন?”
মেয়েটি চমকে তাকাল।
— “ভিজতে ভালো লাগে।”
সাইদ একটু হেসে বলল, “ভিজলে ঠান্ডা লাগবে, তারপর ডাক্তার, ওষুধ—সব মিলিয়ে একটা গল্প দাঁড়াবে।”
মেয়েটি এবার হেসে ফেলল।
— “আপনার নাম গল্পকার হলে মানাতো ভালো।”
এই ছিল প্রথম দেখা, প্রথম কথা।
মেয়েটির নাম ছিল নাহিন। সে ইংরেজি বিভাগের ছাত্রী, থার্ড ইয়ারে পড়ে। আর সাইদ শেষ বর্ষে দর্শন বিভাগে। দুজনের দেখা হতো প্রায়ই টিএসসিতে, কিন্তু কোনোদিন কথাবার্তা হয়নি।
সেদিন বৃষ্টির ফাঁকে যে কথোপকথনের শুরু হয়েছিল, তা আর থামেনি।
প্রথম কয়েক সপ্তাহ টিএসসিতে বসে চা খাওয়া, সাহিত্য নিয়ে আলোচনা, সিনেমার গল্প—এভাবেই সময় কেটেছে। সাইদ অবাক হয়ে খেয়াল করল, নাহিনের চিন্তাধারা একদম অন্যরকম। সাধারণ মেয়েদের মতো নয়, তার দৃষ্টিভঙ্গি গভীর, স্পষ্ট আর আত্মবিশ্বাসী।
— “তুমি প্রেমে বিশ্বাস করো?” একদিন নাহিন জিজ্ঞেস করেছিল।
সাইদ একটু থেমে বলেছিল, “হ্যাঁ, করি। তবে অচেনা প্রেমে আরও বেশি বিশ্বাস করি।”
— “অচেনা প্রেম মানে?”
— “যে প্রেম আমাদের না বুঝেই জড়িয়ে ফেলে। আমরা যাকে ঠিকঠাক চিনতেই পারিনি, অথচ হৃদয়ের এক কোনায় সে চুপচাপ জায়গা করে নেয়। ভালো লাগার ব্যাখ্যা নেই, তবুও টানটা থেকে যায়।”
নাহিন তখন কিছু বলেনি, শুধু মুচকি হেসেছিল। সেই হাসির মধ্যে যেন এক অদ্ভুত সত্য লুকিয়ে ছিল।
সময় গড়ায়।
সাইদ বুঝতে পারে, সে নাহিনকে ভালোবেসে ফেলেছে। কিন্তু মুখে কিছু বলতে পারে না। নাহিনও যেন বুঝে ফেলে কিছু একটা। তবে তার আচরণে কোনো পরিবর্তন আসে না।
একদিন বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাফেটেরিয়ায় বসে, সাইদ সাহস করে বলে ফেলে—
— “তোমাকে একটা কথা বলব… অনেকদিন ধরে বলতে পারছি না।”
নাহিন চা-র কাপটা হাতে নিয়ে তাকায় তার চোখে।
— “বলো, আমি শুনছি।”
— “আমি… তোমাকে ভালোবাসি, নাহিন।”
এক মুহূর্তে নাহিন চুপ হয়ে যায়। চারপাশের কোলাহল যেন থেমে যায় সাইদের কানে। মেয়েটি তাকিয়ে থাকে কিছুক্ষণ, তারপর বলে—
— “সাইদ, আমি তোমাকে অসম্ভব পছন্দ করি। তবে প্রেম… জানি না। আমি ভয় পাই।”
— “ভয় কিসের?”
— “ভয় যদি সবকিছু ভেঙে পড়ে, যদি বন্ধুত্বটুকুও হারিয়ে যায়, যদি আমি তোমাকে আর চিনতে না পারি।”
সাইদ কিছু বলতে পারে না। শুধু মাথা নিচু করে বসে থাকে।
এরপর কিছুদিন দুজনের মধ্যে একটা দূরত্ব চলে আসে। দেখা হয়, কথা হয়, কিন্তু সেই পুরনো উচ্ছ্বাস আর থাকে না।
একদিন বিকেলে, নাহিন ফোন করে বলল, “আজ আসবে টিএসসিতে?”
সাইদ একটু চমকে উঠল।
— “হ্যাঁ, আসব।”
সেদিন আকাশ পরিষ্কার। টিএসসির গাছে গাছে ছায়া, পাখিদের কিচিরমিচির। দুজন পাশাপাশি হাঁটে, কথা হয় খুব কম।
হঠাৎ নাহিন থেমে বলে,
— “আমি তোমাকে ভালোবেসে ফেলেছি, সাইদ।”
সাইদ চুপ করে তাকিয়ে থাকে।
— “কিন্তু আমি নিজেই বুঝতে পারিনি, সময় নিয়েছি। হয়তো এটাকেই অচেনা প্রেম বলে, যেটার ব্যাখ্যা নেই, শুধু অনুভব আছে।”
সেদিন প্রথমবার সাইদ নাহিনের হাত ধরেছিল। চুপচাপ, কোনো শব্দ ছাড়াই, শুধু অনুভব দিয়ে।
দুজনের সম্পর্ক শুরু হয়। আকাশে রোদ থাকে, মাঝেমধ্যে বৃষ্টি নামে। ভালোবাসার রঙে রঙিন হয় তাদের দিনগুলো। ছোট ছোট মুহূর্তে তারা খুঁজে নেয় সুখ।
কিন্তু জীবন সবসময় সোজা পথে হাঁটে না।
সাইদ চাকরির জন্য ঢাকার বাইরে চলে যেতে বাধ্য হয়। নাহিন পড়ে মাস্টার্সে। দূরত্ব বাড়ে, সময় কমে যায়। কথাবার্তা হয় কম, ঝগড়াঝাঁটি হয় মাঝেমধ্যে।
একদিন রাতে, সাইদ ফোন করে বলল—
— “তুমি কি আমাদের আগের মতো ভালোবাসো?”
নাহিন কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল—
— “ভালোবাসা কখনও আগের মতো থাকে না, এটা সময়ের সাথে রূপ বদলায়। কিন্তু আমি এখনো তোমার জন্য অপেক্ষা করি, সাইদ।”
সেই রাতটা দুজনের জন্য অনেক কিছু শিখিয়ে যায়—বিশ্বাস, সহনশীলতা, সময়ের মূল্য।
দুই বছর পর—
সাইদ ফিরে আসে ঢাকায়, পেয়ে যায় একটি ভালো চাকরি। নাহিন তখন একটি কলেজে শিক্ষকতা শুরু করেছে। দুজন আবার একসাথে বসে টিএসসিতে চা খায়।
সেদিন আবার হঠাৎ বৃষ্টি নামে।
সাইদ ছাতা নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। নাহিন ভিজতে থাকে বৃষ্টির ফোঁটায়।
সাইদ হেসে বলে—
— “তুমি এখনো ছাতা তোলো না?”
নাহিন হেসে উত্তর দেয়—
— “ভিজতে ভালো লাগে। কারণ এই বৃষ্টিই আমাকে একদিন তোমার সাথে পরিচয় করিয়েছিল।”
সেদিনের সেই অচেনা প্রেম, আজ পরিচিত ভালোবাসা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
শেষ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন