ঢাকার ব্যস্ত শহরের ভিড়ে একান্তে নিজের জায়গা খুঁজে ফিরছিল আরিফ। বিশ্ববিদ্যালয় জীবন শেষ, চাকরির খোঁজ চলছে, কিন্তু তার ভেতরের শিল্পীসত্তা যেন শহরের কোলাহলে হারিয়ে যেতে বসেছে। সে ছবি আঁকে, কবিতা লেখে, কিন্তু জীবনের বাস্তবতা তাকে ক্রমশ রঙহীন করে তুলছিল।
একদিন বিকেলে, ধানমণ্ডি লেকের পাশে বসে সে স্কেচবুক খুলে বসে ছিল। হঠাৎ পাশে এসে বসে এক মেয়ে বলল, “আপনি প্রতিদিন এখানে বসেন, তাই না?” আরিফ চমকে তাকাল। মেয়েটির পরনে ছিল হালকা নীল শাড়ি, চোখ দুটো গভীর আর মুখে ছিল একরাশ আত্মবিশ্বাস।
“হ্যাঁ,” আরিফ মুচকি হাসল, “তোমার চোখে কী যেন আছে, একটা গল্প লুকিয়ে আছে মনে হয়।”
মেয়েটি হেসে বলল, “আমার নাম অনন্যা। আমি গল্প বলি না, গল্প খুঁজি।”
সেদিন থেকেই শুরু হলো দু’জনের কথোপকথন। প্রতিদিন বিকেলেই দেখা হতো, কেউ কিছু জোর করত না, শুধু গল্প, হাসি আর কিছু না বলা অনুভবের খেলা। আরিফ ধীরে ধীরে বুঝতে পারল, অনন্যা শুধু একজন সুন্দরী মেয়ে নয়, ওর ভেতর আছে এক গভীরতা। সে সাহিত্য পড়ে, নাটক ভালোবাসে, জীবনকে দেখে এক ভিন্ন দৃষ্টিতে।
অনন্যা জানাল, সে একটি এনজিওতে কাজ করে, শিশুদের জন্য একটি পাঠশালায় পড়ায়। তার স্বপ্ন—একদিন নিজের একটা স্কুল খুলবে। আরিফ মুগ্ধ হয়ে শুনত। তার স্কেচবুকে অনন্যার ছবি আঁকা শুরু করল। কোনোদিন সে আঁকত অনন্যার হাসি, কোনোদিন তার চোখের অভিমান।
দিন পেরোতে থাকল। একদিন আরিফ বলল, “তুমি জানো, আমি তোমার সঙ্গে থাকলে অন্যরকম হয়ে যাই। আমি আবার ছবি আঁকতে পারি, কবিতা লিখতে পারি।”
অনন্যা চুপ করে ছিল। তারপর বলল, “আরিফ, ভালোবাসা মানে নিজেকে খুঁজে পাওয়া, কিন্তু সেটা যদি দায়িত্বের সঙ্গে না আসে, তবে তা শুধু আবেগ।”
আরিফ একটু হতাশ হলো, কিন্তু বুঝে গেল—অনন্যা সহজ নয়, তার জীবনকে গভীরভাবে বোঝে। সে সময় নিল।
এক বছর কেটে গেল। এই সময়ের মধ্যে তাদের সম্পর্ক আরও গভীর হলো। একদিন আরিফ সাহস করে বলল, “অনন্যা, আমি চাই তুমি আমার জীবনের প্রতিটি ছবির পাশে থাকো। তুমি কি আমার সঙ্গে পথ চলবে?”
অনন্যা হেসে বলল, “তুমি কি জানো আমি ক্যান্সারে ভুগছি?”
আরিফের মাথায় যেন বাজ পড়ল। সে বিশ্বাস করতে পারছিল না।
অনন্যা চোখে জল এনে বলল, “ডাক্তার বলেছে সময় বেশি নেই। আমি চাই না আমার জীবনের শেষ দিনগুলো কারও কাছে বোঝা হয়ে থাকুক। আমি তোমায় ভালোবাসি, কিন্তু মুক্ত রাখতে চাই।”
আরিফ চুপচাপ অনন্যার হাত ধরল। “ভালোবাসা মানে বোঝা নয়, অনন্যা। তুমি যদি জীবনকে ভয় না পাও, আমি কেন ভয় পাব? আমি থাকব তোমার পাশে—শেষ দিন, শেষ নিঃশ্বাস পর্যন্ত।”
এরপর শুরু হলো এক অন্যরকম গল্প। আরিফ প্রতিদিন অনন্যাকে নিয়ে যেত লেকে, হাসপাতালেও তার পাশে থাকত, এমনকি অনন্যার জন্য একটি কবিতা সংকলনও প্রকাশ করল, যার নাম ছিল “নীলাকাশের নিচে তুমি”।
দিন গড়াতে গড়াতে অনন্যার শরীর দুর্বল হয়ে পড়ছিল। একদিন বিকেলে, লেকের ধারে বসে অনন্যা বলল, “তুমি যদি কখনও আমাকে হারিয়ে ফেলো, মনে রেখো—আমি তোমার ছবির প্রতিটি রঙে আছি।”
আরিফ কিছু বলল না। সে শুধু অনন্যার চোখের দিকে তাকিয়ে রইল।
শেষ দিনটায়, অনন্যা হাসপাতালে, নিঃশব্দে শুয়ে ছিল। আরিফ তার হাত ধরে কবিতা পড়ছিল—
"তুমি যে নীল রঙের মেয়ে,
তোমার চোখে আকাশ থাকে।
তুমি চলে গেলে কি আকাশ রঙহীন হবে?
না, সে থাকবে, কারণ তুমি তাকে চিরদিন রাঙিয়ে গেছো।"
অনন্যা চোখ মেলল, হেসে বলল, “ভালোবাসি।”
সেই শেষ কথা। তারপর অনন্যা চলে গেল—নীলাকাশের ওপারে।
আজও আরিফ ধানমণ্ডি লেকে বসে, স্কেচবুক নিয়ে। অনন্যার ছবি আঁকে, আর বলে, “তুমি শুধু স্মৃতি নও, তুমি আমার শিল্পের আত্মা।”
শেষ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন