বৃষ্টিভেজা রাতে প্রেমের গল্প

বৃষ্টিভেজা রাতে প্রেমের গল্প; চরিত্র: আকাশ ও বৃষ্টি)


রাত দশটা। ঢাকার আকাশটা আজ ভীষণ চুপচাপ, অথচ কয়েক ঘণ্টা আগেও বজ্রসহ বৃষ্টি হচ্ছিল। রাস্তার ল্যাম্পপোস্টগুলো ঝাপসা আলো ছড়াচ্ছে, ভেজা রাস্তায় আলো পড়ে কেমন যেন কুয়াশাচ্ছন্ন স্বপ্ন মনে হয়।

আকাশ ছাদে দাঁড়িয়ে আছে। গায়ে একটা পাতলা শার্ট, পায়ের নিচে ভেজা মেঝে। তবুও নড়ছে না। তার মনে চলছে ঝড়—যেমন ঝড় নেমেছিল কয়েক ঘণ্টা আগেও আকাশে, আর এখন চলছে তার ভেতরে।

বৃষ্টি আজ ফোন দেয়নি।

গত তিন বছর ধরে যেকোনো বৃষ্টি নামলেই আকাশ ছাদে চলে আসে। ঠিক যেমনটা তারা একদিন শুরু করেছিল—একসঙ্গে। কলেজের শেষ বর্ষে, প্রথমবার দু’জন বৃষ্টির মধ্যে ভিজে হেঁটেছিল হাত ধরাধরি করে। সেদিন বৃষ্টি বলেছিল, “বৃষ্টি মানেই তো ভালোবাসা, না?”

আকাশ চুপ করে ছিল। তখনো সে বুঝতে পারেনি, এই মেয়েটার সঙ্গে সময় কাটানো মানে এক ধরনের নেশা, এক ধরনের নির্ভরতা।


বৃষ্টি ছিল অন্যরকম। হাসলে চোখ দুটো মুচড়ে যেত, আর সবসময় কিছু একটা না কিছু নিয়ে কথা বলতেই থাকত। সে বলত—“আকাশ, তুমি এত চুপচাপ কেন?” আকাশ বলত, “তুমি তো কথা বলোই সবসময়, আমাকে কিছু বলার সুযোগ দাও কখন?”

এমন হাজারটা খুনসুটি, হাসি, অভিমান আর ভালোবাসায় তাদের সময় কেটেছিল।

কিন্তু সময় তো আর চিরকাল থেমে থাকে না। বৃষ্টির বাবার হঠাৎ চাকরি বদলি হয়ে যায় চট্টগ্রামে। ওরা তখন মাস্টার্সের শেষ বর্ষে। হঠাৎ করে দূরত্ব তৈরি হয়ে যায়, আর সেই দূরত্বই এক সময় একটা দেয়াল হয়ে দাঁড়ায়। প্রথমে প্রতি রাতে কথা হতো, তারপর দিনে একবার, পরে সপ্তাহে একদিন। তারপর একসময় বৃষ্টি বলেছিল, “আকাশ, আমরা কী করছি আসলে? কিসের অপেক্ষায় আছি?”

আকাশ চুপ করে গিয়েছিল।


আকাশের মধ্যে অনুভূতির শব্দগুলো জমে থাকে—সে বলে না, লিখেও না। শুধু বুঝে, অনুভব করে। তাই সে সেদিনও কিছু বলেনি। কিন্তু সে ভুলেও যায় না, কিছু ফেলে দিতেও পারে না।

আজ যে রাতটায় বৃষ্টি আসেনি, সেটি ছিল তাদের 'তিন বছরের সম্পর্কের বার্ষিকী'র রাত।

এমন রাতে তারা দু’জন একসঙ্গে ছাদে গিয়ে ভিজত, কফি খেত, গান শোনাতো একে অপরকে—আর বৃষ্টি বলত, “তুমি যদি একদিন হুট করে চলে যাও, আমি কিভাবে থাকব?”

আর আকাশ বলত, “আমি গেলে তো তুমি থেমে যাবে না। বৃষ্টি থেমে গেলে পৃথিবী চলে না, কিন্তু আকাশ না থাকলেও বৃষ্টি হয়।”

তখন বৃষ্টি অভিমান করত, “তুমি সবসময় এমন নিষ্ঠুর কথা বলো কেন?”


আজ বৃষ্টির কোনো খবর নেই। না কোনো ফোন, না কোনো মেসেজ। আকাশ বুঝে গেছে, বৃষ্টি এবার সত্যিই চলে গেছে।

হয়ত এখন সে অন্য কারো পাশে ঘুমিয়ে আছে, হয়ত তার নতুন কোনো আকাশ আছে—যার নিচে সে আবার বৃষ্টিতে ভিজছে।

আকাশের মনে পড়ে, একবার বৃষ্টি বলেছিল, “যেদিন তুমি থাকবে না, আমি কাকে বৃষ্টিতে ভিজতে ডাকব?”

আকাশ সেই দিনটার কথা ভাবেনি কখনো, আজ ভাবছে।

স্মৃতিগুলো বুকের মধ্যে টানছে, কাঁচি দিয়ে কেটে নেওয়ার মতো। আকাশ ছাদের এক কোণে দাঁড়িয়ে, ভেজা বাতাসে চোখের পলক ফেলছে ধীরে ধীরে।


ঠিক তখনই—একটা পরিচিত শব্দ।

পায়ের আওয়াজ।

আকাশ তাকিয়ে দেখে, ভেজা চুলে, হলুদ রেইনকোটে একটা মেয়ে ছাদে উঠে এসেছে।

বৃষ্টি!

হাঁপাতে হাঁপাতে বলে, “তুমি এখনো...?”

আকাশ কথা বলতে পারে না।

বৃষ্টি বলে, “আমি জানি, আমি অনেক দেরি করে ফেলেছি। জানি না, তুমি এখনও অপেক্ষা করো কিনা। কিন্তু আজ যখন বৃষ্টি শুরু হলো, আমি আর থাকতে পারলাম না। সেই পুরনো গন্ধ, পুরনো ছাদ, আর...তুমি।”

আকাশ এগিয়ে যায় ধীরে ধীরে। বৃষ্টির চোখে জল, মুখে একরাশ ভেজা হাসি।

সে বলে, “আজ বৃষ্টি আর আকাশ আবার একসঙ্গে... যদি চাও।”

আকাশ শুধু মাথা নাড়ে। বলে, “তুমি না বললেও, আমি প্রতিদিন তোমার জন্য এই ছাদে আসি।”

বৃষ্টি এক পা এগিয়ে এসে আকাশের বুকের সঙ্গে কপাল ঠেকিয়ে ফেলে।

বৃষ্টির ফোঁটা দু’জনের গায়ে পড়ে। কে বলতে পারে, কোনটা আসলে বৃষ্টির জল, আর কোনটা তাদের চোখের?


রাত বাড়ে, বৃষ্টি পড়ে টুপটাপ।

দু’জনেই ছাদে দাঁড়িয়ে, কোনো কথা নেই, কোনো ব্যাখ্যা নেই।

শুধু একটুকরো শান্তি। একটুকরো ফিরে পাওয়া।

কারণ রোমান্টিক প্রেমগুলো কখনো শেষ হয় না—সে হয়তো থেমে যায়, হারিয়ে যায়, দূরত্ব বাড়ে, ভুল বোঝাবুঝি হয়।

কিন্তু ঠিক একটা বৃষ্টিভেজা রাতে, সব আবারও ফিরে আসে, ঠিক যেখানে থেমে গিয়েছিল।

                                  

                                 শেষ

0 মন্তব্যসমূহ

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

Post a Comment (0)

নবীনতর পূর্বতন